বাংলায় মুসলিম শাসন, উপনিবেশিক শাসন ও বঙ্গভঙ্গ — Bank Job

বাংলায় মুসলিম শাসন, উপনিবেশিক শাসন ও বঙ্গভঙ্গ: সাধারণ জ্ঞান, Bank Job পাঠ ও 0টি প্রশ্নের অনুশীলন। পৃষ্ঠা 1/1।

এ অধ্যায়ের পাঠ্যসূচী
ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের সূচনা
Beginning of Muslim Rule in the Indian Subcontinent
ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম রাজনৈতিক প্রভাবের সূচনা কয়েকটি পর্যায়ে ঘটে। আরব, তুর্কি ও আফগান শক্তির ধারাবাহিক অভিযানের মধ্য দিয়ে উত্তর ভারতে মুসলিম শাসনের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে মুহাম্মদ ঘুরীর অভিযান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তরাইনের যুদ্ধসমূহ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।

মুহাম্মদ ঘুরীর পর তাঁর সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবেক দিল্লিকেন্দ্রিক স্বাধীন শাসনের সূচনা করেন। এর মধ্য দিয়ে দিল্লি সালতানাতের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
দিল্লি সালতানাত
Delhi Sultanate
দিল্লিকেন্দ্রিক মুসলিম শাসন মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে ছিল। কুতুবউদ্দিন আইবেকের মাধ্যমে দিল্লি সালতানাতের সূচনা হয়।

দিল্লি সালতানাতের শাসনপর্বে বিভিন্ন বংশ পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসে। মামলুক বা দাস বংশ, খলজি বংশ, তুঘলক বংশ, সৈয়দ বংশ এবং লোদি বংশ এই ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কুতুবউদ্দিন আইবেককে দাস বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর শাসনকালে কুতুব মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরবর্তীকালে ইলতুৎমিশ এ কাজ এগিয়ে নেন।

আলাউদ্দিন খলজি মূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বাজারব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ, দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় কঠোরতা তাঁর শাসনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

খলজি ও তুঘলক আমলে দিল্লি সালতানাতের বিস্তার বৃদ্ধি পেলেও বিভিন্ন বিদ্রোহ, উত্তরাধিকার সংকট ও প্রশাসনিক সমস্যায় পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বল হতে থাকে।
বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা
Beginning of Muslim Rule in Bengal
বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি সেন শাসক লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে নদীয়া দখল করেন।

প্রদত্ত তথ্যে বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠার সময় হিসেবে \(1204\) খ্রিস্টাব্দের উল্লেখ রয়েছে। তবে কিছু ঐতিহাসিক আলোচনায় \(1205\) খ্রিস্টাব্দও পাওয়া যায়।

বখতিয়ার খলজি বাংলায় নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর তাঁর অভিযান আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করেন। তাঁর শাসনের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম রাজনৈতিক আধিপত্যের নতুন যুগ শুরু হয়।
বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসন
Independent Sultanate of Bengal
দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলায় স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। চতুর্দশ শতকে বাংলা দিল্লির নিয়ন্ত্রণ থেকে কার্যত স্বাধীন হয়ে একটি স্বতন্ত্র সুলতানি রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হয়।

শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহকে সমগ্র বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীন সুলতানি শাসন সুসংহত করার জন্য বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। তাঁর শাসনামলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে আনা হয়।

ইলিয়াস শাহী শাসকগণ প্রশাসন, স্থাপত্য ও রাজনৈতিক সংহতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। বাংলার নিজস্ব স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয় এই সময় আরও সুদৃঢ় হয়।
হোসেনশাহী বংশ
Hussain Shahi Dynasty
পঞ্চদশ শতকের শেষদিকে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বাংলায় হোসেনশাহী বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনকাল বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

হোসেন শাহের শাসনকালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। তাঁর আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পায়।

হোসেন শাহকে মধ্যযুগীয় বাংলার একজন শক্তিশালী ও জনপ্রিয় সুলতান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর শাসনকালে বাংলার ভূখণ্ড ও প্রভাব বিস্তার লাভ করে।

পরাগল খান ও ছুটি খানসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাঁর সময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্যচর্চা ও ধর্মীয় সহাবস্থানের ক্ষেত্রেও এই সময়টি উল্লেখযোগ্য।
বারো ভূঁইয়া
Baro Bhuiyans
মুঘল শাসনের বিস্তারের সময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের শক্তিশালী স্থানীয় জমিদার ও সামন্তপ্রধানেরা কেন্দ্রীয় মুঘল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ইতিহাসে এই শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতাদের একটি গোষ্ঠীকে বারো ভূঁইয়া বলা হয়।

বারো ভূঁইয়া শব্দটি সবসময় নির্দিষ্ট বারোজন ব্যক্তিকে বোঝায় না। বরং বিভিন্ন সময়ে মুঘলবিরোধী স্বাধীন বা আধা-স্বাধীন স্থানীয় শাসকদের সম্মিলিত পরিচয় হিসেবে শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

ঈসা খান বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নেতা ছিলেন। তাঁর প্রধান শক্তিকেন্দ্র ছিল ভাটি অঞ্চল। তাঁর রাজধানীর সঙ্গে সোনারগাঁয়ের নাম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

ঈসা খানের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুসা খান মুঘলবিরোধী প্রতিরোধ চালিয়ে যান। পরবর্তীতে মুঘল সুবাদার ইসলাম খানের সময়ে বারো ভূঁইয়াদের শক্তি দমন করা হয় এবং মুঘল কর্তৃত্ব আরও সুসংহত হয়।
মুঘল আমলে বাংলা
Bengal under the Mughals
মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে বাংলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবা হিসেবে পরিচালিত হয়। সম্রাট আকবরের শাসনকালে বাংলায় মুঘল কর্তৃত্ব আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধের কারণে বাংলায় মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সহজ ছিল না। পরবর্তীকালে ইসলাম খানের সময় এই প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।

সুবাদার ইসলাম খান বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকায় স্থানান্তর করেন। তাঁর সময় ঢাকার নাম জাহাঙ্গীরনগর রাখা হয়।

মুঘল আমলে বাংলায় প্রশাসন, রাজস্ব, বাণিজ্য, স্থাপত্য এবং নগরজীবনের উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটে।
বাংলায় নবাবি আমল
Nawabi Era of Bengal
মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বল হতে থাকলে বাংলায় সুবাদার ও নবাবেরা ক্রমে স্বাধীনভাবে ক্ষমতা পরিচালনা করতে শুরু করেন। এর ফলে বাংলায় নবাবি শাসনের বিকাশ ঘটে।

মুর্শিদকুলি খান বাংলার নবাবি শাসনের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তিনি রাজস্ব প্রশাসনকে পুনর্গঠন করেন এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন।

মুর্শিদকুলি খানের পর সুজাউদ্দিন খান এবং আলীবর্দী খানসহ বিভিন্ন নবাব বাংলা শাসন করেন। আলীবর্দী খানের সময় মারাঠা আক্রমণ বাংলার জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

আলীবর্দী খানের পর সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। তাঁর সময় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছে এবং শেষ পর্যন্ত পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
ঢাকায় বাংলার রাজধানী
Establishment of Bengal's Capital at Dhaka
মুঘল সুবাদার ইসলাম খান বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্র রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। এর ফলে ঢাকা প্রথমবারের মতো বাংলার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।

ঢাকার নাম পরিবর্তন করে জাহাঙ্গীরনগর রাখা হয়। পরবর্তীকালে প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলার রাজধানী বিভিন্ন সময়ে ঢাকা, রাজমহল ও মুর্শিদাবাদের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়।

সুবাদার শায়েস্তা খানের সময় ঢাকা বাণিজ্য ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়। মুঘল আমলে ঢাকার মসলিন, কারুশিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষ খ্যাতি লাভ করে।
বাংলায় ইউরোপীয়দের আগমন
Arrival of European Traders in Bengal
সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমনের পর বাংলার সঙ্গে ইউরোপীয় বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রথমদিকে পর্তুগিজরা বাংলায় আসে। পরবর্তীকালে ওলন্দাজ, ইংরেজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকগোষ্ঠী বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে।

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় বাণিজ্যিক অধিকার লাভ করে এবং ধীরে ধীরে নিজেদের বাণিজ্যকেন্দ্র ও কুঠি স্থাপন করে।

সুরাটে ইংরেজদের প্রাথমিক বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের পর বাংলার বিভিন্ন বন্দর ও নগরে কোম্পানির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়।

মুঘল শাসকদের কাছ থেকে বাণিজ্যসংক্রান্ত অনুমতি ও সুযোগ লাভের মাধ্যমে ইংরেজ কোম্পানি বাংলায় ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ব্রিটিশ শাসনের সূচনা ও বিস্তার
Rise and Expansion of British Rule
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলায় প্রবেশ করলেও ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। নবাবি শাসনের দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানি বাংলার রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে।

পলাশীর যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এ যুদ্ধের পর ইংরেজ কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

পরবর্তীকালে কোম্পানি বাংলার রাজস্ব ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। দেওয়ানি অধিকার লাভের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা কোম্পানির হাতে চলে যায়।

এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক কোম্পানির ভূমিকা ক্রমে শাসকশক্তির রূপ নেয় এবং বাংলায় ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি সুসংহত হয়।
উপনিবেশিক প্রশাসন ও সংস্কার
Colonial Administration and Reforms
ব্রিটিশ শাসনকালে বিভিন্ন গভর্নর ও গভর্নর জেনারেল প্রশাসন, বিচার, রাজস্ব, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং সামাজিক ক্ষেত্রে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলায় কোম্পানির প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর শাসনামলে রাজস্ব ও বিচারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়।

লর্ড কর্নওয়ালিস প্রশাসনিক ও রাজস্ব ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেন। তাঁর সময় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হয় এবং প্রশাসনিক কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট নীতি গড়ে ওঠে।

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমলে সতীদাহ প্রথা বিলোপ, প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রসারসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

লর্ড ডালহৌসির সময় রেলপথ, ডাকব্যবস্থা, টেলিগ্রাফ এবং আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামোর বিকাশ ঘটে।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
Permanent Settlement
ব্রিটিশ রাজস্ব প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। লর্ড কর্নওয়ালিসের সময়ে এই ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে জমির ওপর জমিদার শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হয়।

রাজস্ব নির্ধারণের এই ব্যবস্থায় কৃষকদের অবস্থান সবসময় নিরাপদ ছিল না। জমিদারি কাঠামোর কারণে গ্রামীণ সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পায়।
নীল চাষ ও নীল বিদ্রোহ
Indigo Cultivation and Indigo Revolt
ব্রিটিশ আমলে বাংলার কৃষকদের ওপর জোরপূর্বক নীল চাষ চাপিয়ে দেওয়ার কারণে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ইউরোপীয় নীলকররা কৃষকদের বিভিন্নভাবে নীল চাষে বাধ্য করত।

নীল চাষে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। এই প্রতিবাদ পরবর্তীতে নীল বিদ্রোহে রূপ নেয়।

নীল বিদ্রোহ বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে কৃষকদের শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ব্রিটিশ গভর্নর ও গভর্নর জেনারেলদের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
Important Measures of British Governors
লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস
দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটান।
প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থার সংস্কারে ভূমিকা রাখেন।
রাজস্ব ব্যবস্থাকে কোম্পানির অধিক সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেন।

লর্ড কর্নওয়ালিস
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।
প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কার আনেন।
কোম্পানির কর্মচারীদের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করেন।

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক
সতীদাহ প্রথা বিলোপের সঙ্গে যুক্ত।
ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
প্রশাসনিক ব্যয় কমানো ও সামাজিক সংস্কারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

লর্ড ডালহৌসি
রেল যোগাযোগ প্রবর্তনে ভূমিকা রাখেন।
ডাক ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করেন।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকীকরণ করেন।

লর্ড ক্যানিং
তাঁর সময় ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং কোম্পানি শাসনের অবসানের পর সরাসরি ব্রিটিশ রাজশাসনের যুগ শুরু হয়।

লর্ড রিপন
স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রসারে ভূমিকা রাখেন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক উদারনীতির সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত।

লর্ড কার্জন
তাঁর সময় বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হয়।
প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও বিভিন্ন শিক্ষা-প্রশাসনিক পদক্ষেপের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত।

লর্ড মিন্টো
মর্লি-মিন্টো সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত।

লর্ড চেমসফোর্ড
মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত।
রাওলাট আইনের সময় তাঁর শাসনকাল ছিল।

লর্ড আরউইন
সাইমন কমিশনের সময় ভারতের ভাইসরয় ছিলেন।

লর্ড ওয়াভেল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায় ও ভারতীয় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত।

লর্ড মাউন্টব্যাটেন
ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভারত বিভাগের সময় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বঙ্গভঙ্গ
Partition of Bengal
ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক যুক্তি দেখিয়ে বাংলা প্রদেশকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। লর্ড কার্জনের শাসনামলে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হয়।

\(1905\) সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। বাংলা দুটি প্রশাসনিক অংশে বিভক্ত হয়। একদিকে পূর্ববঙ্গ ও আসাম এবং অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় বাংলা প্রদেশ গঠিত হয়।

পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী করা হয় ঢাকা। এই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস রাজনৈতিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

বঙ্গভঙ্গের বিরোধীরা মনে করতেন, বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ঐক্য দুর্বল করাই এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের কিছু অংশে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থনও দেখা যায়।

ব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখে \(1911\) সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়।
স্বদেশি আন্দোলন
Swadeshi Movement
বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন শক্তিশালী হয়। এ আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল বিদেশি পণ্য বর্জন, দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জাতীয় চেতনা জাগ্রত করা।

স্বদেশি আন্দোলন রাজনৈতিক প্রতিবাদের পাশাপাশি শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার ধারণাকেও উৎসাহিত করে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। রাখীবন্ধন উৎসবকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বাংলার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশাত্মবোধক গান এই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক শক্তি বৃদ্ধি করে। তাঁর রচিত বিভিন্ন গান বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় মানুষের মধ্যে ঐক্য ও স্বদেশচেতনা জাগাতে ব্যবহৃত হয়।

স্বদেশি আন্দোলনের সময় বিদেশি পণ্য বর্জনের পাশাপাশি দেশীয় শিল্প, শিক্ষা ও ব্যবসা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের সঙ্গে অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার ধারণাও আরও শক্তিশালী হয়।