বাংলা সাহিত্যের প্রাথমিক আলোচনা, যুগবিভাগ, চর্যাপদ ও মধ্যযুগ — Primary Teacher

বাংলা সাহিত্যের প্রাথমিক আলোচনা, যুগবিভাগ, চর্যাপদ ও মধ্যযুগ: বাংলা, Primary Teacher পাঠ ও 10টি প্রশ্নের অনুশীলন। পৃষ্ঠা 1/1।

এ অধ্যায়ের পাঠ্যসূচী
বাংলা ভা???ার উৎস ও পরিচয়
Origin of Bangla Language
মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হলো ভাষা। বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এই ভাষাগোষ্ঠী প্রধানত কেন্তুম ও শতম—এই দুই শাখায় বিভক্ত বলে আলোচিত হয়েছে। বাংলা ভাষার উৎপত্তি শতম শাখার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলার আদি অধিবাসীদের ভাষা হিসেবে অস্ট্রিক ভাষার উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলা ভাষার প্রত্যক্ষ উৎস হিসেবে প্রাকৃত ভাষার ধারাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ভাষাবিদের ভিন্ন মত রয়েছে। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার উৎস গৌড় অপভ্রংশের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অন্যদিকে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মাগধী প্রাকৃতের ধারাকে বাংলা ভাষার উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বাংলা লিপির উৎপত্তি
বাংলা লিপির উৎপত্তির সঙ্গে ব্রাহ্মী লিপির সম্পর্ক রয়েছে। পাঠ্যসূত্রে বাংলা লিপির উৎস হিসেবে ব্রাহ্মী লিপির উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলা ভাষার বিকাশ যেমন দীর্ঘ সময়ের বিবর্তনের ফল, তেমনি বাংলা লিপিও ধাপে ধাপে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে।
বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ
Periods of Bangla Literature
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করে আলোচনা করা হয়—

১। প্রাচীন যুগ — প্রায় ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ
২। মধ্যযুগ — প্রায় ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ
৩। আধুনিক যুগ — ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমানকাল

মধ্যযুগের ভেতরে আবার অন্ধকার যুগ ও শ্রীচৈতন্য-প্রভাবিত সাহিত্যপর্বসহ কয়েকটি স্বতন্ত্র পর্যায়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের সময়সীমা প্রায় ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধরা হয়েছে। এই যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক নিদর্শন চর্যাপদ।

চর্যাপদের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম লিখিত রূপের পরিচয় পাওয়া যায়। বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের ধর্মসাধনা, দর্শন ও জীবনভাবনা এর প্রধান বিষয়।
চর্যাপদ
Charyapada
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘চর্যা’ শব্দটি জীবনযাপন, সাধনা বা আচরণের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। চর্যাপদের প্রকৃত নাম হিসেবে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

চর্যাপদকে ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামেও আলোচনা করা হয়েছে। এটি মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের সাধনসংগীতের সংকলন।

চর্যাপদের মূল ধর্মীয় পটভূমি বৌদ্ধধর্ম, বিশেষত সহজিয়া বা তান্ত্রিক বৌদ্ধসাধনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
চর্যাপদ আবিষ্কার ও প্রকাশ
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কার করেন। পাঠ্যসূত্র অনুযায়ী ১৯০৭ সালে পুঁথিটি উদ্ধার করা হয়।

পরবর্তীতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ১৯১৬ সালে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে এটি প্রকাশিত হয়।

চর্যাপদ আবিষ্কারের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা সম্ভব হয়।
চর্যাপদের ভাষা ও বিষয়
চর্যাপদের ভাষাকে ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা ‘সান্ধ্য ভাষা’ বলা হয়। এর ভাষায় এমন প্রতীকী ও রহস্যময় প্রকাশভঙ্গি রয়েছে, যার প্রত্যক্ষ অর্থের আড়ালে সাধনতাত্ত্বিক অর্থ নিহিত থাকে।

চর্যার ভাষায় প্রাচীন বাংলা ভাষার পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক ও প্রাচীন ভাষার উপাদানের উপস্থিতি দেখা যায়।

বৌদ্ধ সহজিয়া মত, দেহতত্ত্ব, সাধনা, সংসারজীবনের বিভিন্ন চিত্র এবং রূপকধর্মী উপস্থাপন চর্যাপদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
চর্যাপদের কবি ও পদসংখ্যা
চর্যাপদের মোট পদসংখ্যা ৫১টি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে উদ্ধার হওয়া পদের সংখ্যা সাড়ে ৪৬টি।

চর্যাপদের কবিদের সাধারণভাবে সিদ্ধাচার্য বলা হয়। লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা, শবরপা, কুক্কুরীপা প্রমুখ চর্যাকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

চর্যাপদে সর্বাধিক পদ রচনাকারী হিসেবে কাহ্নপার নাম পাওয়া যায়। তাঁর রচিত পদের সংখ্যা ১৩টি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চর্যাপদের আদি কবি হিসেবে লুইপার নাম উল্লেখযোগ্য।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ
Medieval Period of Bangla Literature
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের সময়সীমা প্রায় ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধরা হয়। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা সাহিত্য ধর্মীয়, কাহিনিনির্ভর ও গীতিময় নানা ধারায় সমৃদ্ধ হয়।

মধ্যযুগের সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলি, জীবনী সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, কবিগান, অনুবাদ সাহিত্য, পুঁথি সাহিত্য ও মরসিয়া সাহিত্য উল্লেখযোগ্য।

এই যুগের সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধর্মকেন্দ্রিকতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
অন্ধকার যুগ
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের প্রারম্ভিক একটি সময়কে ‘অন্ধকার যুগ’ বলা হয়। এর সময়সীমা প্রায় ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধরা হয়েছে।

এই সময় থেকে সাহিত্যিক নিদর্শন তুলনামূলক কম পাওয়া যায়। এ কারণেই সাহিত্য-ইতিহাসে এই সময়কে অন্ধকার যুগ নামে অভিহিত করা হয়েছে।

পাঠ্যসূত্রে এই যুগের সঙ্গে তুর্কি শাসনামলের সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
মধ্যযুগের প্রাচীন সাহিত্যিক নিদর্শনের মধ্যে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ অন্যতম। এর রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস।

গ্রন্থটি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনিকে কেন্দ্র করে রচিত। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ আবিষ্কার করেন বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ। পাঠ্যসূত্রে ১৯০৯ সালে গ্রন্থটি আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
বৈষ্ণব পদাবলি
রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা ও ভক্তিভাবকে কেন্দ্র করে রচিত গীতিকবিতাকে বৈষ্ণব পদাবলি বলা হয়। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় সাহিত্যধারা হয়ে ওঠে।

বিদ্যাপতিকে পদাবলির আদি কবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ব্রজবুলি ভাষায় বহু পদ রচনা করেন। বাংলা ভাষায় পদাবলি রচনায় বড়ু চণ্ডীদাসের নাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বৈষ্ণব পদাবলিতে প্রেম, বিরহ, মিলন, ভক্তি ও মানবিক অনুভূতির অপূর্ব প্রকাশ দেখা যায়।
শ্রীচৈতন্য ও জীবনী সাহিত্য
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যদেবের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রচারিত বৈষ্ণব ভাবধারা বাংলা কবিতা ও সংগীতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

শ্রীচৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে জীবনী সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ ধারা গড়ে ওঠে। তাঁর জীবন ও ধর্মপ্রচারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কবি জীবনীমূলক কাব্য রচনা করেন।

চৈতন্য-পরবর্তী সাহিত্যধারায় বৈষ্ণব পদাবলি বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে।
মঙ্গলকাব্য
হিন্দু ধর্মীয় দেবদেবী এবং তাঁদের মাহাত্ম্য প্রচারকে কেন্দ্র করে যে কাব্যধারা গড়ে ওঠে, তাকে মঙ্গলকাব্য বলা হয়।

মঙ্গলকাব্যের প্রধান বিষয় ছিল বিভিন্ন দেবদেবীর মাহাত্ম্য, পূজা প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের পার্থিব জীবনে তাঁদের প্রভাব।

মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল এই ধারার উল্লেখযোগ্য শাখা।

মনসামঙ্গলের জনপ্রিয় কাহিনির মধ্যে চাঁদ সদাগর, বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দর বিশেষভাবে পরিচিত।
মনসামঙ্গল
মনসামঙ্গল কাব্যে দেবী মনসার মাহাত্ম্য ও পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনি প্রধান বিষয়। চাঁদ সদাগরের সঙ্গে মনসার দ্বন্দ্ব এবং বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের কাহিনি এ ধারার অন্যতম জনপ্রিয় অংশ।

মনসামঙ্গল ধারার উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে কানাহরিদত্তের নাম পাওয়া যায়।
রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান
মধ্যযুগে মুসলিম কবিদের হাতে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান বাংলা সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে বিকশিত হয়। প্রেমকাহিনি, মানবিক সম্পর্ক ও কল্পনামিশ্রিত ঘটনাপ্রবাহ এই ধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বাংলা সাহিত্যের রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ধারার প্রথম কবি হিসেবে শাহ মুহম্মদ সগীরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর রচিত ‘ইউসুফ-জুলেখা’ এই ধারার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

ইউসুফ-জুলেখার কাহিনি ধর্মীয় উৎস থেকে আগত হলেও বাংলা কাব্যে তা প্রেমকাহিনির রূপ লাভ করেছে।
মধ্যযুগের মুসলিম কবি
মধ্যযুগে মুসলিম কবিদের অবদান বাংলা সাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। শাহ মুহম্মদ সগীর, দৌলত কাজী, আলাওল প্রমুখ কবি এই সময়ের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক।

শাহ মুহম্মদ সগীরকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আলাওলকে মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর সাহিত্যকর্মে অনুবাদ, রোমান্টিক কাহিনি এবং ধর্মীয়-নৈতিক বিষয় একত্রে পাওয়া যায়।
আলাওল
আলাওল আরাকান রাজসভাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। মধ্যযুগের মুসলিম কবিদের মধ্যে তাঁর অবস্থান বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।

‘পদ্মাবতী’ তাঁর সবচেয়ে পরিচিত কাব্যগুলোর একটি। এটি ঐতিহাসিক প্রণয়োপাখ্যানধর্মী কাব্য হিসেবে আলোচিত।

‘সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল’ এবং অন্যান্য অনুবাদ ও প্রণয়কাহিনিমূলক রচনাও তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের অংশ।
আরাকান রাজসভা ও বাংলা সাহিত্য
আরাকান রাজসভা মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে মুসলিম কবিরা সাহিত্যচর্চার অনুকূল পরিবেশ পেয়েছিলেন।

আরাকানের প্রথম বাঙালি কবি হিসেবে দৌলত কাজীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে আলাওল এই সাহিত্যধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেন।
পুঁথি সাহিত্য
আরবি, ফারসি, বাংলা ও হিন্দি-উৎসের নানা শব্দের মিশ্রণে রচিত একটি বিশেষ সাহিত্যধারা পুঁথি সাহিত্য নামে পরিচিত। এটি প্রধানত মুসলিম সমাজে জনপ্রিয় ছিল।

পুঁথি সাহিত্যের কবিদের ‘শায়ের’ বলা হতো। পুঁথি সাহিত্যের প্রাচীন লেখকদের মধ্যে ফকির গরীবুল্লাহর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

‘আমির হামজা’ পুঁথি সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় কাহিনি। ফকির গরীবুল্লাহর রচিত ও প্রচলিত পুঁথিকাব্য বাংলা মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিল।
কবিগান ও কবিয়াল
মধ্যযুগের শেষভাগ এবং আধুনিক যুগের সূচনাপর্বে কবিগানের বিকাশ ঘটে। কবিগানে সাধারণত দুই কবিয়ালের মধ্যে তাৎক্ষণিক ছন্দ, যুক্তি, প্রশ্নোত্তর ও প্রতিযোগিতামূলক গানের পরিবেশনা দেখা যেত।

কবিগানের রচয়িতা ও পরিবেশকদের কবিয়াল বলা হয়। তাঁরা অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে গান রচনা করে প্রতিপক্ষকে উত্তর দিতেন।

কবিগানের মাধ্যমে লোকসংস্কৃতি, সামাজিক জীবন এবং সাধারণ মানুষের বিনোদনের একটি স্বতন্ত্র ধারা গড়ে ওঠে।
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ
Modern Period of Bangla Literature
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনা ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ধরা হয়েছে। এই যুগে বাংলা গদ্যের বিকাশ, সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, আধুনিক কবিতা ও অনুবাদ সাহিত্যের প্রসার ঘটে।

ঊনবিংশ শতক বাংলা গদ্যের বিকাশে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মুদ্রণযন্ত্র এবং অনুবাদচর্চা বাংলা ভাষার আধুনিক রূপ গঠনে বড় ভূমিকা পালন করে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বাংলা গদ্য বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পাঠ্যসূত্র অনুযায়ী কলেজটি ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮০১ সালে বাংলা বিভাগ চালু হয়।

কলেজটি ১৮৫৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম শিক্ষক হিসেবে উইলিয়াম কেরির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক ও গদ্যগ্রন্থ রচনায় কলেজের শিক্ষক ও পণ্ডিতেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখক ও গ্রন্থ
উইলিয়াম কেরি
বাংলা গদ্যচর্চা, কথোপকথনধর্মী রচনা এবং বাংলা ভাষাশিক্ষার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের মধ্যে সর্বাধিক গ্রন্থরচনার জন্য উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচনার মধ্যে ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ বিশেষভাবে পরিচিত।

চণ্ডীচরণ মুন্সী
‘তোতা ইতিহাস’-এর সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত।

তারিণীচরণ মিত্র
বিদেশি ও প্রাচ্য সাহিত্যের অনুবাদমূলক রচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

রামরাম বসু
বাংলা গদ্য বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ের অন্যতম লেখক।
লেখক
উইলিয়াম কেরি
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
চণ্ডীচরণ মুন্সী
তারিণীচরণ মিত্র
রামরাম বসু
গোলকনাথ শর্মা
উল্লেখযোগ্য রচনা
কথোপকথন ও ইতিহাসমালা
রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র ও অন্যান্য গ্রন্থ
তোতা ইতিহাস
অনুবাদধর্মী রচনা
গদ্য ও ঐতিহাসিক রচনা
হিতোপদেশজাতীয় রচনা
বাংলা গদ্যের বিকাশ
বাংলা গদ্যের সুসংগঠিত বিকাশ আধুনিক যুগে ঘটে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কেন্দ্র করে অনুবাদ, পাঠ্যপুস্তক এবং ইতিহাসধর্মী গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে বাংলা গদ্যের ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।

‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ বাংলা গদ্যের প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলা গদ্যকে আধুনিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুবাদক, পণ্ডিত, শিক্ষক ও সমাজসংস্কারকদের সম্মিলিত ভূমিকা ছিল।
বাংলা ভাষায় অনুবাদচর্চা
বাংলা ভাষার প্রাথমিক অনুবাদচর্চায় ধর্মীয় ও কাহিনিনির্ভর সাহিত্যের প্রভাব ছিল। পাঠ্যসূত্রে মহাভারতের অনুবাদকদের মধ্যে কবীন্দ্র পরমেশ্বর, কাশীরাম দাস এবং অন্যান্য কবির নাম পাওয়া যায়।

রামায়ণের বাংলা রূপান্তরের ক্ষেত্রে কৃত্তিবাস ওঝার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর রামায়ণ বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সাহিত্য সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান
ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে বাংলা সাহিত্য ও মুসলিম সমাজের সাহিত্যচর্চাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে ওঠে।

মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি
নবাব আবদুল লতিফের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠন। পাঠ্যসূত্রে এর প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৬৩ সাল হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ
১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত। এর সঙ্গে মুসলিম সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ‘শিখা’ পত্রিকা এই সংগঠনের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত।

এ ধরনের সংগঠন বাংলা ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজসংস্কারমূলক চিন্তার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন — চর্যাপদ
চর্যাপদের আদি কবি — লুইপা
চর্যাপদ আবিষ্কারক — হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রচয়িতা — বড়ু চণ্ডীদাস
বাংলা ভাষায় পদাবলির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কবি — বড়ু চণ্ডীদাস
রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের প্রথম কবি — শাহ মুহম্মদ সগীর
প্রথম মুসলিম কবি — শাহ মুহম্মদ সগীর
মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবি — আলাওল
আরাকান রাজসভার প্রথম বাঙালি কবি — দৌলত কাজী
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম শিক্ষক — উইলিয়াম কেরি
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে সর্বাধিক গ্রন্থরচয়িতা — মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
পুঁথি সাহিত্যের প্রাচীন উল্লেখযোগ্য কবি — ফকির গরীবুল্লাহ
পরীক্ষোপযোগী যুগসীমা
প্রাচীন যুগ — ৬৫০–১২০০ খ্রিষ্টাব্দ
মধ্যযুগ — ১২০১–১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ
অন্ধকার যুগ — ১২০১–১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ
আধুনিক যুগ — ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান

বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ নির্ধারণে সাহিত্যিক পরিবর্তন, ভাষার রূপ, ধর্মীয় প্রভাব, সামাজিক অবস্থা ও সাহিত্যধারার পরিবর্তন বিবেচনা করা হয়।
দ্রুত পুনরালোচনা
চর্যাপদ — বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন
চর্যাচর্যবিনিশ্চয় — চর্যাপদের মূল নাম
সন্ধ্যা ভাষা — চর্যাপদের ভাষার পরিচিত নাম
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী — চর্যাপদ আবিষ্কারক
বড়ু চণ্ডীদাস — শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রচয়িতা
বিদ্যাপতি — পদাবলি সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি
শাহ মুহম্মদ সগীর — ইউসুফ-জুলেখার রচয়িতা
আলাওল — মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবি
ফকির গরীবুল্লাহ — পুঁথি সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কবি
উইলিয়াম কেরি — ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম শিক্ষক
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার — ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সর্বাধিক গ্রন্থরচয়িতা পণ্ডিতদের অন্যতম
  1. নিচের কোন বাক্যে ‘পাকা’ শব্দটি সরাসরি পক্ব বা পরিণত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?
    • পাকা বাড়ি
    • পাকা রং
    • পাকা কাজ
    • পাকা আম
  2. ‘মুখ তোলা’ কথাটির বিশেষ অর্থ কী?
    • নিজের মুখ ওপরে তোলা
    • অন্যের মুখ তুলে ধরা
    • প্রসন্ন বা অনুকূল হওয়া
    • নষ্ট করা
  3. ‘কার মাথায় হাত বুলিয়েছ’— এখানে ‘মাথায় হাত বুলানো’ কথাটির বিশেষ অর্থ কী?
    • যত্ন করা
    • স্পর্শ করা
    • ফাঁকি বা প্রতারণা করা
    • উপায় বের করা
  4. নিচের কোন বাক্যে ‘মাথা’ শব্দটি বুদ্ধি বা চিন্তাশক্তি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?
    • তিনিই সমাজের মাথা
    • লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেল
    • মাথা নেই, তার মাথাব্যথা
    • মাথা খাটিয়ে কাজ করবে
  5. নিচের কোন কথাটিতে ‘মাথা’ শব্দের সঙ্গে রোগ বা অসুস্থতার অর্থ যুক্ত হয়েছে?
    • মাথা ব্যথা
    • মাথা ঘামানো
    • মাথা ধরা
    • মাথা দেওয়া
  6. ‘যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা’— এখানে ‘মুখ’ শব্দটি কোন বিশেষ অর্থ প্রকাশ করেছে?
    • অনুভূতি
    • গালি
    • প্রত্যঙ্গ
    • সামর্থ্য বা যোগ্যতা
  7. ‘এই ব্যাপারে তোমার কোনো হাত নেই’— এখানে ‘হাত’ শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?
    • যশ
    • কর্তৃত্ব বা সংশ্লিষ্টতা
    • জ্ঞান
    • অভিজ্ঞতা
  8. নিচের কোন বাক্যে ‘পা’ শব্দটি অবজ্ঞা বা তুচ্ছ করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?
    • ভাই, কারো পায়ে ধরা না
    • বড় সাহেবের পায়ে তেল দিয়ে সে প্রমোশন পেল
    • হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলো না
    • উপায় করব, তবু কারো পা চাটব না
  9. ‘সহায়তার অভাবে স্কুলটি উঠে গেছে’— এখানে ‘উঠে গেছে’ কথাটির অর্থ কী?
    • ভেঙে পড়েছে
    • বন্ধ হয়ে গেছে
    • স্থানান্তরিত হয়েছে
    • উন্নতি করেছে
  10. নিচের কোন বাক্যে ‘পাকা’ শব্দটি বিশেষ বা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?
    • পাকা আম খেতে মিষ্টি
    • ছেলেট?? ভয়েও পাকা
    • পাকা সোনায় খাদ থাকে না
    • শাড়িটির রং পাকা